৫ই এপ্রিল, ২০২০ ইং, ২২শে চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১২ই শাবান, ১৪৪১ হিজরী

শিরোনামঃ-

যাত্রী পরিবহনের আড়ালে ডাকাতি, ঝরছে প্রাণ

ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২০

Spread the love

যাত্রী পরিবহনের আড়ালে ডাকাতি, ঝরছে প্রাণ

মো:আব্দুর রহিম বাবলু:—

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একাধিক সশস্ত্র ডাকাত ও ছিনতাইকারী দল। প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও পিকআপে রাত-দিন যাত্রী পরিবহনের নামে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। বিশেষ করে রাতে প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস নিয়ে স্টেশনগুলো থেকে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার নামে সুবিধাজনক স্থানে ওঁৎ পেতে থাকে ডাকাত দল। পরে নির্জন স্থানে নিয়ে সর্বস্ব কেড়ে নেয়। এতে প্রাণনাশের মতো ঘটনাও ঘটছে। সম্প্রতি যাত্রী পরিবহনের নামে সশস্ত্র ডাকাত দলের হাতে কয়েকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে কুমিল্লায়। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মহাসড়কের চান্দিনায় পিকআপে যাত্রী পরিবহনের নামে কথিত চালক ও হেলপারের হাতে খুন হন কাপড় ব্যবসায়ী তোফাজ্জল হোসেন। এছাড়াও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে মহাসড়কের চৌদ্দগ্রামে ডাকাত দলের হাতে মোক্তার হোসেন সৈকত নামে এক যুবক খুন হওয়ার বিষয়টি গত শনিবার সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। এর আগে গত ৯ জানুয়ারি ঢাকা থেকে গাড়িযোগে কুমিল্লায় আসা যুবলীগ নেতা খায়রুল আলম সাধনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় মহাসড়কের সদর দক্ষিণ এলাকা থেকে। এ ঘটনার প্রায় এক মাস অতিবাহিত হলেও মামলার তদন্ত সংস্থা ডিবি পুলিশ হত্যাকাণ্ডের রহস্য বের করতে পারেনি। তবে সম্প্রতি জেলা পুলিশ মহাসড়কের কয়েকটি স্থানে অভিযান চলিয়ে রাতে ডাকাতি ও ছিনতাইকালে একাধিক সশস্ত্র ডাকাত ও ছিনতাইকারী চক্রকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানিয়েছেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম।
সাধন হত্যাকাণ্ড:
গত ৯ জানুয়ারি দুপুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার মোস্তফাপুর এলাকা থেকে কুমিল্লা জেলা পরিষদ সদস্য ও মুরাদনগর উপজেলা যুব লীগের আহ্বায়ক খায়রুল আলম সাধনের (৫০) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত সাধন মুরাদনগর উপজেলার ভুবনঘর গ্রামের মৃত সুলতান মাহমুদের ছেলে। ঘটনার দিন সকালে ঢাকার বনশ্রী এলাকার বাসা থেকে দুই লাখ টাকা নিয়ে খায়রুল আলম সাধন জেলার মুরাদনগরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল।
পরিবারের ধারণা প্রাইভেট কোনো গাড়িযোগে তিনি মুরাদনগরে ফিরছিলেন। ছিনতাইকারীরা তাকে গাড়ির ভেতর হত্যা করে মরদেহ জেলার সদর দক্ষিণের মহাসড়ক সংলগ্ন মোস্তফপুরে ফেলে যায়। বর্তমানে মামলাটি থানা পুলিশের পর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করছে।
এ বিষয়ে ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ারুল আজিম বলেন, সাধন হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আমাদের তদন্ত অব্যাহত আছে। তবে এখনও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। তবে এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সৈকত হত্যাকাণ্ড:
কুমিল্লা পিবিআই জানায়, গত ২১ জানুয়ারি ভোর সাড়ে ৪টায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিরশ্বানী বাজার এলাকা থেকে মিয়াবাজার হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা মাথা ও মুখমণ্ডল থেতলানো অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির মরতেহ উদ্ধার করে। পুলিশ ও স্থানীয়দের ধারণা ছিল এটি সড়ক দুর্ঘটনা। খবর পেয়ে পিবিআই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং ফিঙ্গার প্রিন্ট আইডেন্টিফিকেশনের মাধ্যমে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করে।
এ সময় মরদেহের বাঁ হাতের কব্জিতে কাটা দাগ দেখে এটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে ধরে নিয়ে তদন্ত চালায় পিবিআই। এরপর তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘটনার ১৬ দিনের মধ্যে সৈকতের ঘাতক ছিনতাইকারী ফেনীর সদরের নোয়াবাদ গ্রামের আবুল হাসনাত ওরফে তারেক (২৮), দক্ষিণ শর্শদি গ্রামের সৈয়দ হাফিজুর রহমান সাইফুল (২৬) ও কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার বাতাখালী গ্রামের মো. রাসেলকে (১৯) গ্রেফতার করা হয় এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার রহস্য উদঘাটন করা হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ওসমান গনি জানান, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানিয়েছে- তারা মহাসড়কে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের সদস্য। গত ২০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় তারা একটি প্রাইভেটকার (ঢাকা-মেট্রো গ-২৯-৩৫৯৪) ভাড়া নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে বের হয়। ওই রাতে তারা ফেনী থেকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার পর্যন্ত মহাড়কের কয়েকটি স্থানে টাকা ও মোবাইল ছিনতাই করে। পরে ফেনী ফেরার পথে রাত দেড়টার দিকে চৌদ্দগ্রামের মিরশ্বানী বাজার এলাকায় সড়কের পাশে সৈকতকে হাঁটতে দেখে তাকে টানাহেচড়া করে প্রাইভেটকারে তুলে নেয় এবং মারধর করে মোবাইল ও টাকা কেড়ে নিয়ে লাথি মেরে তাকে সড়কে ফেলে দিয়ে গাড়ি চাপায় হত্যা করে।
ব্যবসায়ী তোফাজ্জল হোসেন হত্যাকাণ্ড:
গত বৃহস্পতিবার (৬ ফেব্রুয়ারি) গভীর রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের জেলার চান্দিনা উপজেলার গোবিন্দপুর এলাকায় ছুরিকাঘাতে তোফাজ্জল হোসেন (৩৮) নামে এক কাপড় ব্যবসায়ী নিহত হন। এ সময় আহত হন নিহতের শ্যালক ফয়সাল রহমান (২৮)। এ ঘটনায় ছিনতাই কাজে ব্যবহৃত পিকআপ ও ছিনতাইকারী চক্রের দুই সদস্য গাড়ি চালক ও সহযোগী চালককে আটক করে পুলিশ। নিহত ওই ব্যবসায়ী সিরাজগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার তেলকুপি গ্রামের আবু বক্কর ছিদ্দিকের ছেলে। পুলিশ জানায়, ব্যবসায়ী তোফাজ্জল হোসেন ও তার শ্যালক ফয়সাল রহমান সিরাজগঞ্জ থেকে কাপড় এনে কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার হকার্স মার্কেটে বিক্রি করতেন। বৃহস্পতিবার রাতে বাড়ি ফেরার জন্য তারা রওনা হন। কিন্তু কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় রাত প্রায় সোয়া ১২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও সিরাজগঞ্জ কিংবা ঢাকার কোনো বাস পাননি। রাত ১২টা ২০মিনিটের সময় একটি পিকআপ তাদের সামনে দাঁড়ায়। এ সময় পিকআপে থাকা হেলপার ঢাকায় যাবে কিনা জানতে চায়। উপায় না পেয়ে তারা পিকআপে উঠে পড়ে। এ সময় পিকআপের চালক, একজন সহযোগী চালক ও একজন হেলপার ছিল। পিকআপটি মহাসড়কের চান্দিনার গোবিন্দপুর এলাকায় পৌঁছামাত্র গাড়ি থামিয়ে চালক ও সহযোগী চালক তাদেরকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে গাড়ি চালক ও তার সঙ্গে থাকা অন্যান্যরা ভগ্নিপতি ও শ্যালককে ছুরিকাঘাত করে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আহতদের চান্দিনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনার পর কর্তব্যরত ডাক্তার তোফাজ্জলকে মৃত ঘোষণা করেন।
ব্যবসায়ী চারু মিয়া হত্যাকাণ্ড:
গত ৩ ফেব্রুয়ারি নারিকেল ব্যবসায়ী চারু মিয়ার মরদেহ কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের পাশ থেকে অজ্ঞাত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। বুড়িচং থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক জানান, গত ৩ ফেব্রুয়ারি বুড়িচংয়ের পারুয়ারা এলাকার কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের পাশ থেকে আজ্ঞাত অবস্থায় এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং অজ্ঞাত অবস্থায় মরদেহটি দাফন করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে বুড়িচং থানায় হত্যা মামলা করে। পরে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে খবর ও ছবি দেখতে পেয়ে ওই ব্যক্তির নাম চারু মিয়া বলে নিশ্চিত করে তার স্বজনরা। চারু মিয়া ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মাধবপুর এলাকার বাসিন্দা এবং পেশায় সে একজন নারিকেল ব্যবসায়ী।
হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার রাতে তিনি নোয়াখালি থেকে ৭ বস্তা নারিকেল নিয়ে ময়নামতি সেনানিবাস এলাকায় নামেন। পরে সেনানিবাস এলাকা থেকে একটি পিকআপ ভাড়া করে নারিকেল নিয়ে নিজ বাড়িতে রওনা হন। মাঝপথে তাকে হত্যা করে ফেলে দেয় পিকআপে থাকা অন্যান্যরা। এছাড়া চারু মিয়ার কিনে আনা নারিকেল, তার সাথে থাকা টাকা ও মোবাইল নিয়ে পালিয়ে যায় ঘাতকরা।
গ্রেফতার একাধিক সশস্ত্র ডাকাত ও ছিনতাইকারী দল:
গত ১৯ জানুয়ারি গভীর রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বাবুর্চি নামক এলাকায় পুলিশ এ অভিযান চালিয়ে এক নারীসহ ডাকাত দলের ১১ সদস্যকে গ্রেফতার করে। এ সময় বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্রসহ ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল এবং লুণ্ঠিত নগদ টাকা ও মালামাল উদ্ধার করা হয়। এর আগে গত ১৭ জানয়ারি রাত ২টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহসড়কের বুড়িচং উপজেলার কবিলা মনিপুর এলাকায় ডাকাতির প্রস্তুতিকালে একটি বিদেশি পিস্তল,গুলি ও দেশীয় অস্ত্রসহ ৫ ডাকাতকে গ্রেফতার করেছে বুড়িচং থানা ও দেবপুর ফাঁড়ি পুলিশ।
পুলিশ জানায়, মোটরসাইকেল যোগে আসা একদল ডাকাত একটি মালবাহী ট্রাককে গতিরোধ করে। অস্ত্রের মুখে ট্রাকের ড্রাইভার ও হেলপারদের জিম্মি করে ডাকাতির চেষ্টা চালায়। এ সময় এলাকাবাসীর সহযোগিতায় পুলিশ পাঁচ ডাকাতকে গ্রেফতার করে। কুমিল্লা পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম জানান, মহাসড়কে ছিনতাই ও ডাকাতি প্রতিরোধে পুলিশ তৎপর রয়েছে। ইতোমধ্যে পুলিশ বেশ সফলতাও রয়েছে। অধিকাংশ ঘটনারই রহস্য বের করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। তিনি আরও বলেন, অপরিচিত প্রাইভেট যানবাহনে (মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও পিকআপ) ওঠার বিষয়ে যাত্রীদের আরও সতর্ক থাকা উচিত। কারণ সম্প্রতি যে কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তা প্রাইভেট যানবাহনে যাত্রী হয়ে উঠার কারণেই ঘটেছে

সর্বশেষ খবর

এ বিভাগের আরও খবর

প্রধান সম্পাদক- খোরশেদ আলম চৌধুরী

বার্তা সম্পাদক-মাঈন উদ্দিন দুলাল

সহ সম্পাদক- মোঃ আবদুর রহিম বাবলু

ঢাকা অফিস : রোড # ১৩, নিকুঞ্জ - ২, খিলক্ষেত, ঢাকা-১২২৯,

সম্পাদকীয় অফিস :জোড্ডা বাজার,নাঙ্গলকোট, কুমিল্লা-৩৫৮২

বার্তা বিভাগ-০০২১৮৯২৮২৭৬৯০১,ইমো নাম্বার

Email- nangalkottimes24@gmail.com

প্রধান সম্পাদক কর্তৃক  প্রচারিত ও প্রকাশিত

সাইট উন্নয়নেঃ ICTSYLHET
%d bloggers like this: